সেলিব্রিটি বার্তা

মেরিলিন মনরো-সর্বকালের সেরা আবেদনময়ী নায়িকার জীবনী

পিতৃপরিচয়হীন অবস্থায় মানসিক ভারসাম্যহীন মায়ের গর্ভে জন্ম নেয় একটি মেয়ে। একদিকে দারিদ্র্য, অন্যদিকে অভিভাবকহীনতায় আশ্রয় জোটে এতিমখানায়। পরবর্তীতে জীবনের নানা উত্থান-পতন কাটিয়ে সময় যেন তাকে নতুনভাবে গড়ে তোলে। ছোটবেলার এই অসহয়ত্বই যেন সাফল্যে তার মনোবল হয়ে দাঁড়ায়। ভাগ্যের সুপ্রসন্নতায় মডেল হিসেবে শুরু হয় তার ক্যারিয়ার। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন মার্কিন অভিনেত্রী, মডেল এবং গায়িকা হিসাবে। দুর্ভাগ্য নিয়ে জন্মালেও সৃষ্টিকর্তা যেন দু’হাত ভরে সৌন্দর্য দিয়েছিল তাকে।স্বর্ণকেশী এই সৌন্দর্যের রানীর নাম মেরিলিন মনরো। লাস্যময়ী মনরো তার হাসির ঝলকানিতে, অপার সৌন্দর্যের মুগ্ধতায়, সুমিষ্ট কণ্ঠের আবেশে, তীক্ষ্ণ চাহনিতে মোহাবিষ্ট করে গেছে সমগ্র বিশ্বের লাখ লাখ তরুণকে। তাই মৃত্যুর অর্ধশত বছর পরেও সর্বকালের সেরা আবেদনময়ী তারকা ও অভিনেত্রী হিসেবে শীর্ষে স্মরণ করা হয় হলিউডের সৌন্দর্যের এ রানীকে।

মেরিলিন মনরো ১৯২৬ সালের ১ জুন ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টি হাসপাতালে জন্মগ্রহণ করেন। তার আসল নাম ছিল নর্মা জেন মর্টেনসন। তিনি গ্লাডিস পার্ল বেকারের (প্রদত্ত নাম মনরো, ১৯০২-১৯৮৪) তৃতীয় সন্তান। গ্লাডিস কনসলিডেটেড ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে ফিল্ম নেগেটিভ কাটার হিসেবে কাজ করতেন।গ্লাডিস পনের বছর বয়সে তার চেয়ে নয় বছরের বড় জন নিউটন বেকারকে বিয়ে করেন। তাদের দুই সন্তান রবার্ট (১৯১৭-১৯৩৩) এবং বার্নিস (জন্মঃ ১৯১৯)। ১৯২১ সালে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয় এবং বেকার তার সন্তানদের নিয়ে কেন্টাকি চলে যায়। মনরো তার ভাই বোনদের কথা জানতে পারে এবং তার বড় বোনের সাথে সাক্ষাৎ হয় তার ১২ বছর বয়সে।১৯২৪ সালে গ্লাডিস তার দ্বিতীয় স্বামী মার্টিন এডওয়ার্ড মর্টেনসনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্তু মনরো যখন গ্লাডিসের পেটে তখন তা অন্য কারো সন্তান জানতে পেরে মার্টিন ১৯২৮ সালে তাকে তালাক দেন।

মনরোর পিতার পরিচয় অজ্ঞাত এবং বেকারই তার উপনাম হিসেবে ব্যবহৃত হত।১৯৪২ সালের ১৯ জুন তার ১৬তম জন্মদিনের কয়েকদিন পরে তিনি তার প্রতিবেশীর পুত্র এয়ার ক্রাফট প্লান্টের একজন চাকরিজীবি জেমস “জিম” ডগার্থিকে বিয়ে করেন। শৈশবের বেশিভাগ সময় শিশুপল্লীতে কাটিয়ে,। মনরোর শৈশব কেটেছে অনেক কষ্টে। অনাথ আশ্রমের কঠোর অনুশাসনের মাঝে তার জীবন আরো দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। এরপর ১২ বছর বয়সে এক পালক পিতা-মাতার গৃহে আশ্রয় পান মনরো, ফলে চাইল্ড হোমের অনুশাসন থেকে মুক্তি মেলে তার। সেখানে তিনি পূর্ণ স্বাধীনতায় জীবনযাপন শুরু করেন। এই পালক মা ছিলেন তার আসল মায়েরই বান্ধবী। কিন্তু ভাগ্য সেখানেও তার সহায় ছিল না। ১৯৪২ সালে পরিবারে অভাব দেখা দেয়। ফলে তাদের অভাব-অনটনের মাঝে মনরোর দেখাশোনা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। তাই পুনরায় তারা মনরোকে আশ্রমে পাঠানোর মনঃস্থির করেন। কিন্তু সেখানের আত্যাচারের কথা স্মরণ করেই শিউরে ওঠেন মনরো।

মনরো মডেল হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন, যা পরবর্তীতে ১৯৪৬ সালে তাকে টুয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি ফক্সের সাথে চুক্তিবদ্ধ করে। ১৯৪৬ সালে প্রথম অভিনয় জগতে পা রাখেন মনরো। সেখান থেকেই নর্মা জীন বেকার নাম পরিবর্তন করে পরিচিত হন মেরিলিন মনরো নামে। বাদামী চুলের রঙ পরিবর্তন করে তাতে প্লাটিনামের সোনালী আভা আনেন, পরবর্তীতে এই স্বর্ণালী কেশই তাকে অন্যদের থেকে দৃষ্টিনন্দন করে তোলে দর্শকদের কাছে। ১৯৪৭ সালে টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি ফক্স স্টুডিও পরিচালিত দুটি ছবি প্রকাশ, পায় যাতে খুব অল্প সময়ের জন্য পর্দায় দেখা যায় মনরোকে। কিন্তু এতে তিনি তেমন জায়গা করতে সক্ষম হননি দর্শক-হৃদয়ে। এরপর ১৯৫০ সালে এই স্টুডিও পুনরায় ‘অল অ্যাবাউট ইভ’ চলচিত্রের জন্য তাকে চুক্তিবদ্ধ করে। এই সিনেমায় লাস্যময়ী অভিনয়ে রাতারাতিই তারকা বনে যান তিনি। পরবর্তী দুই বছরে তার সাড়া জাগানো চলচিত্র রাইট ক্রস (১৯৫১), হোম টাউন স্টোরি (১৯৫১), ক্ল্যাশ বাই নাইট (১৯৫২), উই আর নট ম্যারিড (১৯৫২), নায়াগ্রা (১৯৫৩), জেন্টলমেন প্রেফার ব্লন্ডিস (১৯৫৩), হাউ টু মেরি এ মিলিয়নেয়ার (১৯৫৩) প্রভৃতি মুক্তি পায়। সবগুলো সিনেমাতেই তাকে যৌনাবেদনময়ী নারী হিসেবে পর্দায় দেখা যায়।

পর্দায় তার খোলামেলা পোশাক একদিকে যেমন সমালোচনার ঝড় তুলেছে, অন্যদিকে তিনি হয়ে ওঠেন লাখো তরুণের হৃদয়ের রানী। এর ভেতর ‘জেন্টলমেন প্রেফার ব্লন্ডিস’ সিনেমার জন্য তার অভিনয় বিপুলভাবে আলোচিত হয় এবং সর্বস্তরের মানুষের কাছে তিনি গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেন। ব্যবসাসফল এই সিনেমার আয় ছিল প্রোডাকশন খরচের দ্বিগুণ। ‘হাউ টু মেরি এ মিলিয়নেয়ার’ সিনেমাটিও বক্স অফিসে বেশ সাড়া ফেলে। সে বছরেই খ্যাতির শীর্ষে অবস্থিত মনরো প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ উন্মুক্তভাবে নিজেকে প্রকাশিত করেন ‘প্লে বয়’ ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে।সাম লাইক ইট হট ছবিতে অভিনয় করে তিনি শ্রেষ্ঠ সঙ্গীতধর্মী বা কমেডি অভিনেত্রী হিসেবে গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কার লাভ করেন। ক্যারিয়ারের এই মধ্যগগনে জীবনের নানা হতাশায় তিনি অধিক ঔষধ সেবন ও মদ্যপান শুরু করেন। ফলে কাজে অনিয়ম আর অমনযোগী মনরো পরিচালকদের কাছেও অপ্রিয় হতে শুরু করেন। শোনা যায়, এরই মাঝে সন্তানসম্ভবা হলেও জটিলতার কারণে তিনি মা হতে পারেননি।

১৯৬২ সালের ৫ আগস্ট লস অ্যাঞ্জেলেসের ব্রেন্টউডে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন মনরো। ধারণা করা হয়, মাত্রাতিরিক্ত বড়ি খেয়ে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। রিপোর্টে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ড্রাগ ওভারডোজকে দায়ী করা হলেও অনেকে আজও বিশ্বাস করে মনরোকে হত্যা করা হয়েছিল পরিকল্পিতভাবে। মোহনীয় হাসি, ঝলমলে চুলের আভা আর হাসির জাদুতে মনরো রুপালী জগতের মাধ্যমে দর্শক-হৃদয়ে যে জায়গা করে গেছেন, তা আজও অমলিন। তাই মৃত্যুর ৫০ বছর পরও চলচিত্র জগতে সেরা অভিনয়ের জন্য তাকে স্মরণ করা হয়। ১৯৯৯ সালে আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে তাকে ‘গ্রেটেস্ট ফিমেল স্টার অফ অল টাইম’ খেতাব দেওয়া হয়।

 

Tarokaloy/18 February/Shaila

Previous ArticleNext Article